নৌ-ভ্রমনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করলো পথশিশুদের নিয়ে সংগঠন “আমরা করবো জয়”

আজিজুল হাকিম/সাভার প্রতিনিধিঃ আমার জন্য দিনটি ছিলো স্বরনীয়। যেদিন জাবেদ ইকবাল স্যার আমাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন সেদিন থেকে আর তর সইছিলো না কারন আমি ব্যক্তি হিসেবে সমাজে ছিন্নমূল/ সুবিধা বঞ্চিত / পথশিশু মানুষগুলোর জন্য কিছু করার একটা প্লাটফর্ম পেয়েছি এই প্রথম। সারাদিন পথশিশুদের সাথে আড্ডা সে এক বিরল অভিজ্ঞতা।

যে মানুষগুলো সকালে ঘুম থেকে ফেলে দেয়া খাবারেই তাদের ক্ষুধা মেটায়৷ আর ফেলে দেয়া জিনিসপত্র সংগ্রহ ও বিক্রি করাই তাদের প্রধান পেশা৷ তারা থাকে ফুটপাথ, পার্ক অথবা কোনো খোলা জায়গায়৷ কেউ কেউ আবার এই বয়সেই মাদকাসক্তে লিপ্ত হওয়ার মতো অবস্থা তাদের নিয়েই সকাল ৯:৩০টা ঢাকার সদর ঘাট থেকে ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়ন এর উদ্দেশ্যে রওনা করি আমরা। আমাদের সাথে ছিলেন প্রোগ্রামের আয়োজক “আমরা করবো জয়” এর প্রতিষ্ঠাতা জনাব জাবেদ ইকবাল চৌধুরী, ডিএফ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ঢাকা এবং মোঃ নজরুল ইসলাম, পি.এ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ঢাকা ও তেঘরিয়া ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা শাহাদাত ভাই এবং যাদের নিয়ে আয়োজন সেই ২৫জন পথশিশু। (যারা একদিনেই আমার বন্ধু হয়ে গিয়েছে)

 

ট্রলারে তাদের কাছ থেকে যেমন আচরণ আশা করেছিলাম তেমনটা না পেয়ে অবাক হয়েছি এজন্য অবশ্য পুরো কৃতিত্ব দিতে হয় জাবেদ স্যারকে কারন স্যার বিগত একমাস যাবত তাদেরকে নার্সিং করে আজকের এ অবস্থায় নিয়ে এসেছেন। তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন বই কলম।

ট্রলারে যতক্ষন ছিলাম সারাক্ষন তারা হৈ হুল্লোর, নাচানাচিতে মেতে ছিলো। কিছুক্ষণ পরপর নানান পদের চকলেট, কেক, বিস্কিট আরো খেলার সামগ্রী তাদের মাঝে বিতরণ করেছি আমরা।

দুপুর ১:০০টার মধ্যেই আমরা কাউন্দিয়া ঘাটে পৌছাই ঘাটে আমাদেরকে রিসিভ করার জন্য আসেন কাউন্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবসহ পরিষদের ইউপি সচিবসহ সকল মেম্বারগন। চেয়ারম্যান সাহেবকে যেন তাদের আনন্দের সীমা নেই।ইতোমধ্যে ট্রলার থেকে নেমে তারা সবাই চেয়ারম্যান সাহেবকে ঘিরে রেখেছে কার আগে কে তাকে জড়িয়ে ধরতে পারে।

 

চেয়ারম্যান সাহেবের পক্ষ থেকে স্থানীয় একটি কমিনিউটি সেন্টারে দুপুরের খাবারের আয়োজন করা হয়। খাবারের মেনু হিসেবে ছিলো মোড়গ পোলাও যা দেখেই পথশিশুরা নিজেদের মধ্যে বলতে লাগলো, আহ! কি ঘ্রান, এই আমি দুই প্লেট খাবো আমি তিন প্লেট খাবো এই প্রতিযোগীতা। সত্যিই তাদের খাবারের মুহুর্তগুলো অসাধারণ ছিলো যা না দেখে অনুধাবন করা যাবেনা। পথশিশুদের জন্য চেয়ারম্যান সাহেবের নিজ হাতে মেহমানদারি আমরা কেউ ভুলতে পারবো না। শুধু একটা কথাই বলবো অনেক অনেক কৃতজ্ঞ শ্রদ্ধেয় আতিকুর রহমান খাঁন শান্ত সাহেব। আপনাদের মতো লোকের কারনেই আমরা এখনো বিশ্বে মানবিকতায় সেরা। এই বাচ্চাগুলার হৃদয়ে আপনি বেচে থাকবেন বহু বছর।


শিডিউল মোতাবেক ভুড়িভোজ শেষে তাদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কেউ কেউ আবৃত্তি করলো কবিতা, কেউ কেউ গজল, কেউ কেউ গান গাইয়ে মাতিয়ে রাখলো পুরো অনুষ্ঠানকে। পথশিশুদের পারফর্মে সবাই মুগ্ধ। তখন মনে মনে ভাবছিলাম যেদেশে নির্মাণ শ্রমিকদের প্রতিভা বিকাশের জন্য রিয়েলিটি শো করা হয় সেদেশে পথশিশুদের প্রতিভা বিকাশের কথা কেউ চিন্তা করেনা।

তাদের নিজ উদ্যোগে কাউন্দিয়া ইউনিয়ন বাজারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান সবাইকে মুগ্ধ করেছে।


নৌ-ভ্রমন শেষে জাবেদ স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কি উদ্দেশ্যে আপনি পথশিশুদের নিয়ে “আমরা করবো জয়” সংগঠনটি তৈরি করলেন? মাদার তেরেসার একটি উদ্ধৃতি দিয়ে স্যারের সরল স্বীকারোক্তি “তুমি যদি দৃশ্যমান মানুষকে ভালবাসতে না পারো, তবে অদৃশ্য স্রষ্টাকে কী করে ভালবাসবে?”
সমাজের সুবিধা বঞ্চিত পথ শিশুদের কল্যাণে ভাল কিছু করার প্রত্যয়ে অফিস সময়ের বাইরে রাতের বেলা মাঝে মাঝেই সদরঘাট এলাকার পথ শিশুদের সাথে সময় কাটানো। তাদের সাথে মিশে গিয়ে যেটা দেখলাম এদের মাঝে অনেক প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিভা বিকশিত হতে পারছেনা। অনেকে আবার সিগারেট খায়, নেশা করে। ভাবলাম এদের জন্য কিছু করতে হবে। রাতের বেলা কিছু কিছু লেখাপড়ার পাশাপাশি নেশার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মোটিভেশনাল কাজও শুরু করেছি। দেথলাম এতে কাজ হচ্ছে। অনেকেই ভাল হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। আর এ প্রত্যয়ের নাম দিলাম আমরা করবো জয়। এ প্রত্যয়েই আজ সুবিধা বঞ্চিত পথ শিশুদের মানসিক বিকাশ, মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি এবং ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার লক্ষ্যে নৌ-ভ্রমনের আয়োজন। আর আজকের সারাদিনের আয়োজনে খুব কাছে থেকে দেখলাম এ পথশিশুদের অনেক লুকায়িত প্রতিভা। প্রয়োজন শুধু যথাযথ বিকাশের। যথাযথ সুযোগ পেলে এ পথশিশুরাই অনেক উপরে উঠে যেতে পারবে।